A stale hash failed 29 of 59 tests. The tool that refreshes hashes had never seen that copy.
· Dev.to
· Dev.to
· NY Post

Visit afnews.co.za for more information.
· Prothom Alo

বীরেন সোম। আশি ছুঁই ছুঁই। তবু আজও শিল্পের কাছে যেন এক অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থী তিনি। দীর্ঘ শিল্পীজীবনের এ অধ্যবসায়ই তাঁর শিল্পীসত্তার এক বড় পরিচয়। তিনি কাজ করেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে—জলরং, তেলরং, ড্রয়িং, ছাপচিত্র। এঁকেছেন বইয়ের প্রচ্ছদ। তাঁর হাতে ফুটে উঠেছে নান্দনিক সব অলংকরণ। এসব বিভিন্ন মাধ্যমে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি হয়ে উঠেছেন এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষার অধিকারী। তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য কেবল বিষয় নির্বাচনেই নয়; রেখা, রং, টেক্সচার ও পরিসরের সংযত ব্যবহারে তিনি দৃশ্যমান বাস্তবতাকে রূপান্তরিত করেন অনুভূতির নিজস্ব জগতে।
শিল্পী হিসেবে সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি চারুশিল্প বিষয়ে গবেষণা ও শিল্প-ইতিহাসচর্চায়ও বীরেন সোমের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে শিল্পীসমাজ’ এবং ‘বাংলাদেশের চিত্রকলার বিকাশ ও আমার অভিযাত্রা’ বই দুটি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের অমূল্য দলিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষ স্মৃতি, শিল্পীসমাজের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের চিত্রকলার বিকাশের নানা পর্ব তিনি এসব গ্রন্থে নথিবদ্ধ করেছেন। ফলে তাঁর অবদান কেবল সৃষ্টিশীল শিল্পকর্মে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের চারুশিল্পের ইতিহাস ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও তাঁর এ প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ।
Visit casino-promo.biz for more information.
'আমার স্টুডিয়োর একটি পৃষ্ঠা',এচিং অ্যাকোয়াটিন্টবীরেন সোমের শিল্পজীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন গণ–আন্দোলনে তিনি সহযোদ্ধা শিল্পীদের সঙ্গে রাজপথে থেকেছেন; এঁকেছেন পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানার। একাত্তরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশনা বিভাগে নকশাবিদ হিসেবেও কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পরও নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর শিল্পীসত্তা রাজপথের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ফলে তাঁর শিল্পে প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজীবন যেমন উপস্থিত, তেমনি গভীরে প্রবাহিত হয়েছে দেশপ্রেম, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও সমাজচেতনার অন্তস্রোত।
দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে কাজ করার সূত্রে উদ্ভিদ, লতাপাতা, ফুল ও প্রাকৃতিক রূপের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ বীরেন সোমের শিল্প-অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কাজে সেই প্রত্যক্ষ বাস্তবানুগ অনুকরণের প্রবণতা অনেকটাই রূপান্তরিত হয়েছে অলংকারধর্মী, দ্বিমাত্রিক ও প্রাচ্যনির্ভর এক প্রকাশভঙ্গিতে। প্রকৃতির উপাদান এখানে আর নিছক দৃশ্যমান বস্তু নয়; ফুল, পাতা, পাখি, বৃক্ষ কিংবা মানবদেহ হয়ে ওঠে স্মৃতি, অনুভব ও অন্তর্জগতের প্রতীক।
'স্বাধীনতা', এচিং অ্যাকোয়াটিন্টরাজধানীর লালমাটিয়ায় শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে দ্য ইল্যুয়েশন গ্যালারিতে চলমান ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’ বা ‘স্মৃতির গল্প’ শিরোনামের ১৪তম একক চিত্রকলা প্রদর্শনীর বিভিন্ন সিরিজে সেই রূপান্তরের বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখা যায়। প্রিন্টের ওপর মার্কার, জলরং ও গোয়াশের ব্যবহারে লতাপাতা, নর-নারী, রাখাল ও অচিন পাখির উপস্থিতি কখনো লোকজ স্মৃতির, কখনো বাংলার চিরায়ত প্রকৃতির রূপক হয়ে উঠেছে। পাখি এখানে বাস্তব শরীরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার প্রতীকী ও আবেগীয় তাৎপর্যে। ‘পানাম’ ও ঐতিহ্যভিত্তিক কাজগুলোয় অতীত ও বর্তমানের এক আকর্ষণীয় সংলাপ তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালের পানাম নগরের স্থাপত্য ও কলামের লাইভ স্টাডির পুরোনো প্রিন্টের ওপর আবার কাজ করে স্মৃতিকে বর্তমানের টেক্সচার ও ডিজিটাল অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়েছেন শিল্পী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আহসান মঞ্জিল ও পানাম নগরকে ঘিরে নতুন জলরং ও ওয়াশের কাজ। স্থাপত্য এখানে শুধু স্থাপত্য নয়; সময়ের ক্ষয়, স্মৃতি ও ইতিহাসের দৃশ্যমান অবশেষ। এচিং অ্যাকুয়াটিং ও সাম্প্রতিক ‘ব্ল্যাক’ সিরিজে বীরেন সোমের রেখার স্বকীয়তা বিশেষভাবে উজ্জ্বল। কালো তলের ওপর সোনালি ও রুপালি বলপেন, প্যাস্টেল ও রঙিন পেনসিলের স্বতঃস্ফূর্ত রেখায় বাউল, মুক্তিযুদ্ধ, ভেনাস কিংবা ঢেঁকিশাকের মতো বিষয় নতুন প্রতীকী অর্থ লাভ করেছে। পুরোনো এচিং-কাজেও সূক্ষ্ম রেখা, হ্যাচিং ও ক্রস-হ্যাচিংয়ের দক্ষ ব্যবহার আলো-ছায়া, গভীরতা ও রহস্যময় আবহ নির্মাণ করেছে। বিশেষত মানবমুখের ওপর লতাপাতা ও ফুলের উপরিপাতন কিংবা নৈশ প্রকৃতির মধ্যে নত মানবাকৃতির উপস্থিতি মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, ক্ষয়, রূপান্তর ও নশ্বরতার এক অন্তর্মুখী দর্শনের দিকে নিয়ে যায়।
'নগর বাউল', ড্রয়িংশিল্পী রশিদ চৌধুরী একসময় লক্ষ করেছিলেন, বীরেন সোম প্রকৃতির মধ্যে ফুলকে শুধু দেখেননি; বরং ফুলের মধ্যেই আবিষ্কার করেছেন নিসর্গের ব্যাপ্তি। এই পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য আজও অটুট। সময়ের সঙ্গে তাঁর বিষয় ও মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ছন্দ, রেখার সংগীত ও প্রাচ্যচেতনার প্রতি তাঁর আকর্ষণ অক্ষুণ্ন রয়েছে। ফুল, পাতা, পাখি কিংবা মানবদেহ—সবই তাঁর কাছে বৃহত্তর জীবনের রূপক।
বীরেন সোমের শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর স্বভাবজাত সংযম। কবি শামসুর রাহমান যথার্থই তাঁকে নিরলস, বিনয়ী ও আত্মপ্রচারে অনাগ্রহী জাত শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এই নিভৃতচারিতাই সম্ভবত তাঁর দীর্ঘ শিল্পসাধনার শক্তি। তিনি জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেননি; বরং কাজের মধ্য দিয়েই নিজের অবস্থান নির্মাণ করেছেন। চার দশক আগে কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর অক্লান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা লিখেছিলেন; আজকের প্রদর্শনী যেন সেই একই অনুসন্ধিৎসার আরও পরিণত অধ্যায়।
প্রদর্শনীর একমাত্র ক্যানভাস ‘রেড ফ্যান্টাসি’ এবং বিভিন্ন মাধ্যমের কাজগুলো মিলিয়ে বীরেন সোমের শিল্পযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—শিল্প তাঁর কাছে কোনো স্থির অর্জন নয়; এটি নিজেকে ক্রমাগত নতুন করে আবিষ্কারের প্রক্রিয়া। তাঁর রেখা কখনো স্মৃতির, কখনো প্রকৃতির, কখনো মানুষের; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা এসে মেশে বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও জীবনবোধে। ১৪তম একক প্রদর্শনীতে তাই আমরা শুধু এক প্রবীণ শিল্পীর সাম্প্রতিক কাজ দেখি না; দেখি দীর্ঘ শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করে যাওয়া এক শিল্পীর জীবন্ত উত্তরাধিকার। তাঁর রেখায় শাশ্বত বাংলার রূপ যেমন আছে, তেমনি আছে সময়কে অতিক্রম করে শিল্পের নিজস্ব সত্যকে খুঁজে চলার এক নিরন্তর প্রত্যয়।
৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।