Clairet Lipide

উল্টো রথ

· Prothom Alo

নরেন স্যার ক্লাসে ঢুকে সামনের দিকে পা ছড়িয়ে আরাম করে চেয়ারে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে বরাবরের মতো অবজ্ঞামিশ্রিত গাম্ভীর্য নেই। তার বদলে অবয়বজুড়ে চমৎকার প্রশান্তি। নরেন স্যারকে আমরা কখনো এমন খোশমেজাজে দেখিনি। সহপাঠী অবিনাশ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, আজ সূর্যদেব কোন দিক থেকে উঠেছে, রে!

Visit turconews.click for more information.

স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে মুখ খুললেন। ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোরা রথ দেখতে কৈতরা আসিস।’

এতক্ষণে ছাত্রদের প্রতি নরেন স্যারের ঔদার্যের কারণ বোঝা গেল। কৈতরা গ্রামে তাঁর তত্ত্বাবধানে একটি রথ তৈরি করা হয়েছে। নরেন স্যারের বাড়ি কৈতরা। তিনি সেখান থেকে তিন মাইল সাইকেল চালিয়ে আমাদের নবগ্রাম স্কুলে আসতেন। তাঁর ছিল সব বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য। সর্ববিদ্যায় পারদর্শী নরেন স্যারের ছাত্রদের শাসন করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি রকমের নিষ্ঠুরতা ছিল। আমরা ক্লাসে তাঁর ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকতাম। সেই নরেন স্যার যখন ক্লাসে ঢুকে কোমল কণ্ঠে ছাত্রদের রথ দেখার আমন্ত্রণ জানান, তাতে আমরা খানিকটা বিস্মিত হই। ক্লাস শেষে আমরা দল বেঁধে রথ দেখতে কৈতরা যাই। বিচিত্র কারুকাজে চিত্রিত দৃষ্টিনন্দন রথটি মাথা উঁচু করে একটি বিশাল বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। আসলে নরেন স্যার কৈতরার রথের মধ্যে এক স্বর্গীয় সৃষ্টির আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর মনের ভেতর যে প্রশান্তি তৈরি হয়েছিল, তার খানিকটা তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সেদিন ক্লাসের অনুশাসনে কিছুটা নমনীয় হয়েছিলেন। তারপরে দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল। কত শ্রাবণের বৃষ্টিতে কৈতরার পথের ধারের গাছগুলো ভিজতে ভিজতে প্রায় মাটির কাছে নুয়ে পড়তে চায়। চৈত্রের কত দিনে কৈতরা বাজারে সুনসান দুপুরে একাকী বসে থাকা দোকানি দুই হাঁটুর মাঝখানে মুখ গুঁজে ঝিমায়। মা বলে, ‘তুইও বড় হয়ে গেছিস, খোকা।’

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

আমি বড় হয়ে গেছি। আমি ঢাকায় পড়তে যাই। নরেন স্যারের বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সেই রথ খুঁজি। বৈশাখের একদিন বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যা নামে কৈতরা গ্রামের পথে। হঠাৎ ঈশানকোণ থেকে ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে নামে প্রবল বৃষ্টি। আমি সেই বুড়া বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকি। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। এমন সময় কেউ একজন এসে আমার পাশে দাঁড়ান। বলেন, ‘আমি সুরেন, সুরেন মণ্ডল। আমি তোমাকে চিনি। তোমার বাড়ি কালীগঙ্গার দক্ষিণ পাড়ে বরুন্ডী গ্রামে। নবগ্রাম স্কুলে তুমি আমার দুই ক্লাস জুনিয়র ছিলে।’

আমি বলি, এইখানে এই বটতলায় যে রথটি ছিল, সেটি নেই কেন?

সুরেন মণ্ডল একটু সরে এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। আমি চমকে উঠলাম। তাঁর শরীর থেকে কেমন এক অশরীরী স্পর্শ টের পেলাম।

সুরেন মণ্ডল বললেন, ‘সেই কথা আর কাউকে বলিনি। শুধু তোমাকে বলছি। কাউকে বোলো না। আমি দেখেছি। সেই উল্টো রথের দিন। সেদিনও দিন গড়িয়ে সূর্য ডুবে গেল। হঠাৎ আজকের মতো ঈশানকোণ নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল। ঝড়–জলে একাকার কৈতরায় এইখানে এক জ্যোতির্ময়ী রাতুল চরণে হেঁটে এসে রথে আরোহণ করলেন। সেই সময় আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে পাশেই বিকট শব্দে বাজ পড়ল। আমি স্পষ্ট দেখলাম, দেবী সুভদ্রা রথে বসে আছেন। ধীরে ধীরে রথটি আকাশে মিলিয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারালাম।’

হঠাৎ দেখি আমার পাশে কেউ নেই। দূরে নরেন স্যারের মতো কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সুরেন মণ্ডলের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। ঝড়–জলের মধ্যে এক আধিভৌতিক অন্ধকারে আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।

নবগ্রাম স্কুলে সুরেন মণ্ডল নামে কি কেউ ছিল? সেই ঝড়–জলের উল্টো রথের সন্ধ্যায় আমার পাশে এসে কেউ কি দাঁড়িয়েছিল? হতে পারে, না–ও হতে পারে।

অপার রহস্যঘেরা এই ধরিত্রীর বুকে কত কিছুই না ঘটে!

*লেখক: বজলুল হক বিশ্বাস, গভর্নমেন্ট অফিসার্স কমপ্লেক্স, মিরপুর–৬, ঢাকা–১২১৬

Read full story at source

Pakistan military jets strike Kalat in fresh Balochistan attacks: Report

· Times of India

Lording it! Sadiq Khan officially joins the Upper House... where he can pocket £390 a day tax-free on top of £170k London mayor salary

· Daily Mail