কীভাবে এক ভোগবিলাসী যুবক সাধকে রূপান্তরিত হলেন
· Prothom Alo

দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘তাজকিরাত আল-আউলিয়া’ ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকরগ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত; কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫-১৯৬৯) বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রকাশ করেছেন। ২০০০ সালে ইংরেজি ভাষায় এটি ‘মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস’ নামে বের হয়। বইটিতে ৩৮টি অধ্যায়ে ভাগ করে সুফি সাধক ও তাঁদের জীবনের নানা অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি অধ্যায় সিজিস্তান বা বর্তমান আফগানিস্তানসংলগ্ন অঞ্চলের অধিবাসী প্রখ্যাত সুফি সাধক মালেক ইবনে দিনারের নামে। সেখান থেকে এ অধ্যায়টি মূলানুগ অনুবাদ করা হয়েছে।
Visit michezonews.co.za for more information.
মালেক ইবনে দিনার আল-সামি ছিলেন সিজিস্তান বা বর্তমান আফগানিস্তানসংলগ্ন অঞ্চলের অধিবাসী এক পারস্য দাসের ছেলে আর বসরার হাসানের (হাসান বসরির) অন্যতম শিষ্য। একজন নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়; আনাস ইবনে মালেক ও ইবনে সিরিনের মতো ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের বরেণ্য ব্যক্তিদের সূত্র-পরম্পরায় যা সঞ্চারিত হয়েছে। কোরআনের শুরুর দিকের বিশ্রুত এই লিপিকার, আনুমানিক ১৩০ হিজরিতে (৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।
কী করে মালেক-ই দিনার এই নাম পেলেন
মালেক যখন জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর বাবা ছিলেন একজন দাস। কিন্তু দাসের সন্তান হয়েও তিনি ছিলেন দুই জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত। কেউ কেউ বলেন, মালেক-ই দিনার একবার এক জাহাজে চড়ে যাত্রা করেছিলেন। জাহাজ যখন সমুদ্রের অনেক গভীরে পৌঁছায়, নাবিকেরা তখন দাবি করে বসল, ‘তোমার ভাড়া বের করো!’ ‘আমার কাছে সেটা নেই,’ তিনি জবাব দিলেন। তারা তাঁকে এমনভাবে মারধর করল যে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে এলে তারা আবার চিৎকার করে উঠল, ‘তোমার ভাড়া বের করো!’ ‘আমার কাছে সেটা নেই,’ তিনি আবারও বললেন। দ্বিতীয়বারও তারা তাঁকে পিটিয়ে অচেতন করে ফেলল। জ্ঞান যখন ফিরল, তারা তৃতীয়বারের মতো ভাড়া দাবি করল। ‘তোমার ভাড়া বের করো!’ ‘আমার কাছে সেটা নেই’, বললেন তিনি। ‘চলো, ওর পা ধরে তুলি আর ওকে জাহাজের বাইরে ফেলে দিই’, নাবিকেরা চিৎকার করে বলল। ঠিক সেই মুহূর্তে পানির ভেতর থেকে সব মাছ মাথা তুলে ভেসে উঠল। প্রতিটির মুখে ছিল দুটি করে সোনার দিনার। মালেক নিচু হয়ে হাত বাড়ালেন আর ওদের মধ্যে একটা মাছের থেকে দুই দিনার নিয়ে সেটা নাবিকদের দিলেন। এই দৃশ্য দেখে নাবিকেরা তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। তিনি পানির ওপর দিয়ে হেঁটে চললেন, আর উধাও হয়ে গেলেন।
এ কারণেই তাঁকে ডাকা হতো মালেক-ই দিনার।
মালেকের অনুশোচনার কাহিনি
মালেকের রূপান্তরের ঘটনাটি এ রকম—
তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ আর দুনিয়াবি ভোগবিলাসে মত্ত। তাঁর ছিল অঢেল ধনসম্পদ। তিনি থাকতেন দামেস্কে, সেখানে মুয়াবিয়া বিশাল এক জামে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন আর এর পেছনে হাত খুলে খরচ করতেন। সেই মসজিদের মুতাওয়াল্লি বা তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার প্রবল বাসনা ছিল মালেকের। তাই তিনি মসজিদে গেলেন আর এক কোণে নিজের জায়নামাজ পাতলেন। টানা এক বছর সেখানে ইবাদতে মগ্ন থাকলেন—এই আশায়, যে-ই তাঁকে দেখবে, যেন তাঁকে সর্বদা নামাজরত অবস্থায় পায়।
‘কী এক ভণ্ড তুমি!’ তিনি নিজেকে নিজে বলতেন। এক বছর এভাবে কেটে গেল। রাত হলেই তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতেন আর আমোদ-ফুর্তিতে মেতে উঠতেন। এক রাতে তিনি সংগীত-আসরে মশগুল ছিলেন, তাঁর সঙ্গীরা সবাই তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ তিনি যে লুটটি (একপ্রকার বাদ্যযন্ত্র) বাজাচ্ছিলেন, সেখান থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ‘মালেক! তোমার কী হলো যে তুমি অনুতপ্ত হচ্ছ না?’ এ কথা শুনে মালেক যন্ত্রটা ছুড়ে ফেলে দিলেন আর ভীষণ বিচলিত হয়ে মসজিদের দিকে ছুটলেন। ‘পুরো একটা বছর আমি ভণ্ডের মতো আল্লাহর ইবাদত করেছি,’ নিজের মনের সঙ্গে নিজেই তিনি বোঝাপড়া করলেন। ‘এখন কি এটাই উত্তম নয় যে আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর উপাসনা করি? কিন্তু আমি তো লজ্জায় কুঁকড়ে আছি। আমি এখন কী করব? তারা যদি আমাকে এই দায়িত্ব দিতেও চায়, আমি আর সেটা নেব না।’
এআইয়ের সহযোগিতায় আঁকা মালেক ইবনে দিনারের প্রতিকৃতি‘আমরা আপনার কাছে এসেছি একটা সবিনয় অনুরোধ নিয়ে—আপনি যেন এই দায়িত্বটা গ্রহণ করেন,’ তারা বলল। ‘হে আল্লাহ,’ মালেক আর্তস্বরে বলে উঠলেন, ‘পুরো একটা বছর আমি তোমার সেবা করেছি ভণ্ডের মতো, অথচ কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। আর এখন, যখন আমি আমার হৃদয়কে তোমার হাতে সঁপে দিয়েছি আর অটল সংকল্প করেছি যে এই পদটা আমি চাই না, তখনই তুমি বিশজন লোক পাঠিয়েছ—এই দায়িত্ব আমার ঘাড়ে তুলে দিতে! শপথ তোমার মহিমার, আমি এটা চাই না।’ এরপর তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন আর পুরোপুরি নিজেকে প্রভুর কাজে নিবেদিত করলেন—সংযম ও কঠোর সাধনার জীবন বেছে নিয়ে।
অতঃপর তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন আর নিজেকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে অন্তরকে শুদ্ধ করলেন। সেই রাতে তিনি খাঁটি ও নিখাদ হৃদয়ে আরাধনা করলেন। পরদিন যথারীতি লোকেরা মসজিদের সামনে একত্র হলো। ‘আরে, মসজিদের দেয়ালে দেখি চিড় ধরেছে!’ বিস্ময়ে তারা বলে উঠল। ‘এটাকে ঠিকঠাক রাখার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেওয়া দরকার।’ সবার মত এক জায়গায় এসে মিলল যে—এই পদের জন্য মালেকের চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। তাই তারা তাঁর কাছে এল। তিনি তখন নামাজে ছিলেন, ফলে তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল, যতক্ষণ না তাঁর নামাজ শেষ হয়।
‘আমরা আপনার কাছে এসেছি একটা সবিনয় অনুরোধ নিয়ে—আপনি যেন এই দায়িত্বটা গ্রহণ করেন,’ তারা বলল। ‘হে আল্লাহ,’ মালেক আর্তস্বরে বলে উঠলেন, ‘পুরো একটা বছর আমি তোমার সেবা করেছি ভণ্ডের মতো, অথচ কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। আর এখন, যখন আমি আমার হৃদয়কে তোমার হাতে সঁপে দিয়েছি আর অটল সংকল্প করেছি যে এই পদটা আমি চাই না, তখনই তুমি বিশজন লোক পাঠিয়েছ—এই দায়িত্ব আমার ঘাড়ে তুলে দিতে! শপথ তোমার মহিমার, আমি এটা চাই না।’
এরপর তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন আর পুরোপুরি নিজেকে প্রভুর কাজে নিবেদিত করলেন—সংযম ও কঠোর সাধনার জীবন বেছে নিয়ে। ক্রমে তিনি এমন সম্মান ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা অর্জন করলেন এবং তাঁর জীবন এমন উৎকর্ষের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল যে যখন বসরার জনৈক ধনী ব্যক্তি রূপসী এক কন্যা রেখে মারা গেলেন, তখন ওই নারী নিজ থেকে থাবিত-ই বুনানির কাছে প্রস্তাব জানাল। ‘আমি মালেকের স্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি,’ সে ঘোষণা দিল, ‘যাতে আল্লাহর আনুগত্যের সাধনায় তিনি আমাকে সহায়তা করতে পারেন।’ থাবিত এই সংবাদ মালেককে জানালেন। ‘এই দুনিয়াকে আমি তালাক দিয়েছি’, মালেক উত্তরে বললেন। ‘এই নারী সেই দুনিয়ার অন্তর্গত, যাকে আমি ত্যাগ করেছি। তাকে আমি বিয়ে করতে পারি না।’
মালেক ও তাঁর দুর্বিনীত প্রতিবেশী
মালেকের পাড়ায় এক যুবক বাস করত, যার চালচলন ছিল চরম উচ্ছৃঙ্খল ও বখাটে। মালেক তার এমন জঘন্য আচরণে ক্রমাগত পীড়িত বোধ করতেন; কিন্তু অন্য কেউ আগে মুখ খুলবে—এই আশায় ধৈর্য ধরে সব সহ্য করে যাচ্ছিলেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, একসময় অন্যরাও ওই যুবকের নামে অভিযোগ করতে এগিয়ে এল। তখন মালেক তৎপর হলেন আর তার কাছে গিয়ে স্বভাব শোধরানোর তাগিদ দিলেন। কিন্তু ওই যুবক অত্যন্ত একগুঁয়ে আর উদ্ধত প্রতিক্রিয়া দেখাল।
‘আমি সুলতানের খাস লোক,’ সে মালেককে বলল। ‘কারও সাধ্য নেই যে আমাকে আটকায় বা আমার ইচ্ছেমতো চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করে।’ ‘আমি সুলতানকে সব জানিয়ে দেব,’ মালেক হুমকি দিলেন। ‘আমার ওপর সুলতানের যে আস্থা, সেটা থেকে তিনি একচুলও নড়বেন না। আমি যা-ই করি না কেন, তিনি সেটা মেনে নেবেন,’ যুবকটির পাল্টা জবাব। ‘আচ্ছা, সুলতান যদি কিছু করতে না–ও পারেন,’ মালেক বলতে থাকলেন, ‘তবে আমি সেই পরম করুণাময়কে বলব।’ আর তিনি আকাশের দিকে ইশারা করলেন। ‘হা!’ যুবকটি জবাব দিল। ‘তিনি এতটাই দয়ালু যে এসব নিয়ে তিনি আমাকে ধরপাকড় করবেন না।’
কাসারগড়ের থালানগাড়ায় অবস্থিত মহান সূফী সাধক হযরত মালেক বিন দিনার (র.)-এর পবিত্র মাজার শরীফ।বছরের পর বছর কেটে গেল; কিন্তু মালেকের ঠোঁট টক বা মিষ্টি কোনো স্বাদই স্পর্শ করল না। প্রতি রাতে তিনি রুটি বিক্রেতার কাছে যেতেন আর দুটো গোল রুটি কিনতেন, যা দিয়ে তিনি রোজা ভাঙতেন। মাঝেমধ্যে এমন হতো যে রুটিগুলো গরম থাকত; তিনি তাতেই সান্ত্বনা খুঁজে নিতেন আর সেটাকেই রুচিবর্ধক বা অ্যাপেটাইজার হিসেবে গণ্য করতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন আর তাঁর মনে মাংস খাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল।
এই শুনে মালেক দমে গেলেন আর তাকে ছেড়ে চলে এলেন। কয়েক দিন কেটে গেল এবং যুবকটির উচ্ছৃঙ্খলতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। লোকেরা আবারও তার নামে অভিযোগ নিয়ে হাজির হলো। মালেক তাকে তিরস্কার করতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু পথে তিনি এক কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। ‘আমার বন্ধুর ওপর থেকে তোমার হাত সরিয়ে নাও!’ বিস্মিত মালেক যুবকটির কাছে গেলেন। ‘কী ঘটল,’ তাঁকে দেখে ওই যুবক জানতে চাইল, ‘যে আপনি দ্বিতীয়বার এসেছেন?’ ‘আমি এবার তোমাকে বকা দিতে আসিনি,’ মালেক উত্তর দিলেন। ‘আমি স্রেফ তোমাকে এটা জানাতে এসেছি যে এইমাত্র আমি এমন এক আওয়াজ শুনেছি।’ ‘আহ!’ যুবকটি চেঁচিয়ে উঠল। ‘পরিস্থিতি যদি এ রকমই হয়, তবে আমি আমার এই প্রাসাদ পুরোপুরি তাঁর সেবায় উৎসর্গ করলাম। আমার সহায়-সম্বল নিয়ে আমার আর কোনো মাথাব্যথা নেই।’
এই বলে সে সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিল আর অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। মালেক বর্ণনা করেন, বেশ কিছুদিন পর মক্কায় তিনি সেই যুবককে দেখতে পেলেন—একদমই নিঃস্ব এবং শেষনিশ্বাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ‘তিনি আমার বন্ধু,’ হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি।’ আর এ কথা বলতে বলতেই সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করল।
মালেক ও তাঁর কৃচ্ছ্রসাধন
বছরের পর বছর কেটে গেল; কিন্তু মালেকের ঠোঁট টক বা মিষ্টি কোনো স্বাদই স্পর্শ করল না। প্রতি রাতে তিনি রুটি বিক্রেতার কাছে যেতেন আর দুটো গোল রুটি কিনতেন, যা দিয়ে তিনি রোজা ভাঙতেন। মাঝেমধ্যে এমন হতো যে রুটিগুলো গরম থাকত; তিনি তাতেই সান্ত্বনা খুঁজে নিতেন আর সেটাকেই রুচিবর্ধক বা অ্যাপেটাইজার হিসেবে গণ্য করতেন।
একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন আর তাঁর মনে মাংস খাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। টানা ১০ দিন তিনি নিজেকে আটকে রাখলেন; কিন্তু শেষমেশ আর দমন করতে না পেরে তিনি একটা মাংসের দোকানে গেলেন আর দু-তিনটা ভেড়ার পায়া কিনে সেগুলোকে আস্তিনের ভেতর লুকিয়ে ফেললেন। দোকানদার তাঁর এক শাগরেদকে পেছন পেছন পাঠাল, তিনি কী করেন সেটা দেখার জন্য। কিছুক্ষণ পর ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এল।
‘এখান থেকে তিনি একটা নির্জন জায়গায় গেলেন,’ সে এসে জানাল। ‘সেখানে গিয়ে আস্তিন থেকে পায়ের নলিগুলো বের করলেন, সেগুলোকে দুই বা তিনবার চুমু খেলেন, আর তারপর বললেন, “ও আমার মন, তোর জন্য এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ নেই।” এরপর তিনি রুটি ও পায়াগুলো এক ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন, এই বলতে বলতে, “আমার দুর্বল দেহ, ভেবো না যে তোমার ওপর এই যে কষ্টটা আমি চাপাচ্ছি, সেটা শত্রুতাবশত। বরং এটা এ জন্য, যাতে পুনরুত্থানের দিনে তোমাকে জাহান্নামে পুড়তে না হয়। কয়েকটা দিন একটু ধৈর্য ধরো, হয়তো এই পরীক্ষা একসময় শেষ হয়ে যাবে এবং তুমি এমন এক গভীর প্রশান্তিতে ডুবে যাবে, যা কখনোই আর শেষ হবে না।”’
একবার মালেক বলেছিলেন, ‘এ কথাটার মানে আমি বুঝি না, মানুষ যে বলে—চল্লিশ দিন মাংস না খেলে নাকি বুদ্ধিসুদ্ধি কমে যায়। আমি বিশ বছর ধরে মাংস খাইনি, অথচ আমার বুদ্ধিসুদ্ধি তো দিন দিন আরও বেড়েই যাচ্ছে!’
দীর্ঘ চল্লিশ বছর মালেক বসরায় কাটিয়েছেন, অথচ কখনো তাজা খেজুর খেয়ে দেখেননি। যখন পাকা খেজুরের মৌসুম আসত, তিনি বলতেন, ‘বসরার লোকেরা, দেখো, ওসব না খেয়েও আমার পেট শুকিয়ে যায়নি আর তোমরা যারা রোজ খেজুর খাও—তোমাদের পেটও তো আহামরি বড় হয়ে যায়নি।’
কেরালার কাসারগড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মালেক দিনার মসজিদ’‘যদি তুমি খেজুর চাও-ই’, মালেক বললেন, ‘তাহলে টানা এক সপ্তাহ রোজা রাখো, একটাবারও না ভেঙে আর সারা রাত জেগে প্রার্থনা করো। তারপর আমি তোমাকে কিছু খেজুর দেব।’ তাঁর প্রবৃত্তি এতে কিছুটা তৃপ্ত হলো। পুরো এক সপ্তাহ তিনি রাতভর প্রার্থনা করলেন এবং দিনের বেলা রোজা রাখলেন। এরপর তিনি বাজারে গেলেন আর কিছু খেজুর কিনলেন, তারপর সেগুলো খাওয়ার জন্য মসজিদের দিকে রওনা হলেন।
চল্লিশ বছর পর তাঁর মনটা হঠাৎ কেমন অস্থির হয়ে উঠল। অনেক চেষ্টার পরেও তাজা খেজুর খাওয়ার তীব্র ইচ্ছাকে তিনি আর থামাতে পারছিলেন না। কয়েক দিন কেটে গেল—প্রতিদিনই সেই ইচ্ছা আরও প্রবল হতে লাগল আর তিনি নিজের প্রবৃত্তিকে (নফস) দমন করতে থাকলেন। শেষে এমন এক মুহূর্ত এল, নিজের জৈবিক সত্তার এই জেদের কাছে তিনি আর টিকতে পারলেন না। ‘আমি তাজা খেজুর খাব না,’ তিনি প্রতিবাদ করে বললেন। ‘হয় আমাকে মেরে ফেলো, নয়তো মরে যাও!’ সেই রাত্রে এক ঐশী আওয়াজ এল—‘তোমাকে কিছু খেজুর খেতেই হবে। তোমার প্রবৃত্তিকে তার বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দাও।’ এই প্রতিক্রিয়ায়, তাঁর প্রবৃত্তি সুযোগ পেয়ে উচ্চ স্বরে চেঁচামেচি শুরু করল।
‘যদি তুমি খেজুর চাও-ই’, মালেক বললেন, ‘তাহলে টানা এক সপ্তাহ রোজা রাখো, একটাবারও না ভেঙে আর সারা রাত জেগে প্রার্থনা করো। তারপর আমি তোমাকে কিছু খেজুর দেব।’ তাঁর প্রবৃত্তি এতে কিছুটা তৃপ্ত হলো। পুরো এক সপ্তাহ তিনি রাতভর প্রার্থনা করলেন এবং দিনের বেলা রোজা রাখলেন। এরপর তিনি বাজারে গেলেন আর কিছু খেজুর কিনলেন, তারপর সেগুলো খাওয়ার জন্য মসজিদের দিকে রওনা হলেন। ছাদ থেকে একটা ছেলে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘আব্বা, এক ইহুদি কিছু খেজুর কিনেছে আর মসজিদের দিকে যাচ্ছে ওগুলো খাওয়ার জন্য!’ ‘একজন ইহুদির মসজিদে কী কাজ থাকতে পারে?’ লোকটা বিস্মিত হয়ে বলল। সে ওই মুহূর্তে দৌড়ে দেখতে এল ইহুদি লোকটা কে হতে পারে। মালেককে দেখতে পেয়ে, সে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। ‘ছেলেটা ওসব কী বলছিল?’ মালেক জানতে চাইলেন।
‘ওকে মাফ করে দিন, হুজুর’ ছেলেটার বাবার কণ্ঠে মিনতি। ‘সে একটা বাচ্চা, আর কিচ্ছু বোঝে না। আমাদের মহল্লায় অনেক ইহুদি থাকে। আমরা তো একটানা রোজা রাখি আর আমাদের বাচ্চারা দেখে ইহুদিরা দিনের বেলা খাওয়াদাওয়া করছে। তাই ওরা ধরেই নিয়েছে যে—দিনের বেলা যারাই খায়, তারা সবাই ইহুদি। ও যা বলেছে সেটা না বুঝেই বলেছে। আপনি ওকে ক্ষমা করে দিন!’ মালেক যখন এ কথা শুনলেন, এক তীব্র আগুন তাঁর অন্তরাত্মাকে গ্রাস করল। তিনি বুঝতে পারলেন, বাচ্চাটার মুখ দিয়ে আদতে ওপর থেকে কথাটি বলানো হয়েছে। ‘মালিক মাওলা!’ তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ‘আমি একটা খেজুরও এখন পর্যন্ত মুখে দিইনি, অথচ তার আগেই তুমি একটা নিষ্পাপ বাচ্চার মুখ দিয়ে আমাকে “ইহুদি”১ ডাকলে! আর আমি যদি এখন সত্যি সত্যি খেজুর খাওয়া শুরু করি, তাহলে তো তুমি আমাকে “অবিশ্বাসী” হিসেবেই ঘোষণা করবে। শপথ তোমার মহিমার, আমি যদি আর কখনো খেজুর খাই!’
টীকা:
১. এখানে ‘ইহুদি’ শব্দটি কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অবমাননা করার জন্য ব্যবহৃত হয়নি; আখ্যানের প্রেক্ষাপটে শিশুর সরল ধারণা এবং মালেকের আত্মসমালোচনাকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।